চান্দিনায় সাংবাদিকদের হাতকড়া: এসিল্যান্ডের পদক্ষেপ নিয়ে আইনি বিতর্ক
কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলায় দুই সাংবাদিককে হাতকড়া পরিয়ে থানায় পাঠানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রয়োগ, আইনের সীমা এবং সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বুধবার (১ এপ্রিল) দুপুরে উপজেলা ভূমি অফিসে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সাংবাদিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফয়সাল আল নূরের দপ্তরে ভিডিও ধারণকে কেন্দ্র করে দৈনিক মানবজমিনের প্রতিনিধি রাসেল সরকার এবং অনলাইন পোর্টাল ফেস দ্য পিপল-এর প্রতিনিধি আব্দুল আলীমকে হাতকড়া পরিয়ে থানায় পাঠানো হয়। পরে থানায় নিয়ে তাদের মোবাইল ফোন থেকে ধারণ করা ছবি ও ভিডিও মুছে ফেলার অভিযোগও ওঠে।
ভুক্তভোগী সাংবাদিক আব্দুল আলীম জানান, একটি নামজারি সংক্রান্ত বিষয়ে তথ্য জানতে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। সেই আচরণ মোবাইলে ধারণ করতে গেলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে পুলিশ ডেকে এনে তাদের হাতকড়া পরিয়ে থানায় পাঠানো হয়।
তবে অভিযুক্ত সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফয়সাল আল নূর দাবি করেন, অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণ এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার কারণে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চান্দিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান বলেন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশেই পুলিশ দায়িত্ব পালন করেছে।
এ ঘটনার প্রেক্ষিতে আইনি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৫৪ অনুযায়ী পুলিশ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেপ্তার করতে পারে। তবে শুধুমাত্র ভিডিও ধারণের মতো ঘটনায় তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার কতটা যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ১৮৬ অনুযায়ী সরকারি কাজে বাধা দিলে শাস্তির বিধান থাকলেও, সেটি প্রমাণের জন্য সুস্পষ্ট প্রতিবন্ধকতা থাকতে হয়।
হাতকড়া ব্যবহারের ক্ষেত্রেও রয়েছে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা। সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তি পালানোর ঝুঁকি বা সহিংস আচরণের আশঙ্কা থাকলেই কেবল হাতকড়া ব্যবহার করা যেতে পারে। সাধারণ পরিস্থিতিতে এটি নিরুৎসাহিত।
অন্যদিকে, মোবাইল ফো*ন থেকে তথ্য মুছে ফেলার অভিযোগ আইনি দৃষ্টিতে গুরুতর। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া কারও ডিভাইসে প্রবেশ বা তথ্য নষ্ট করা দণ্ডনীয় অপরাধ হতে পারে।
মুচলেকা নেওয়ার ক্ষেত্রেও ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ১০৭ ও ১১৭ অনুযায়ী নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। কোনো চাপ প্রয়োগ করে মুচলেকা আদায় করা হলে তা আইনি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৯ অনুযায়ী মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে, যার মধ্যে সংবাদ সংগ্রহের অধিকারও অন্তর্ভুক্ত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে এই সাংবিধানিক অধিকারকে বিবেচনায় রাখা জরুরি।
ঘটনার পর কুমিল্লা প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন মহল থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসন ও গণমাধ্যম উভয় পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণ এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আরও বড় সংকটের জন্ম দিতে পারে। এখন নজর তদন্ত ও পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপের দিকে।